ভোটের সময় রাজনীতি আমাদের খুব কাছে আসে। তখন আমরা আর সাধারণ মানুষ থাকি না, হয়ে উঠি রাজনীতির কেন্দ্র। তখন আমরা আর অদৃশ্য থাকি না—আমাদের ঘরে যাওয়া হয়, কথা শোনা হয়, কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা হয়।
ভোটের আগে রাজনীতির ভাষা বদলে যায়—শক্ত উচ্চারণের বদলে কণ্ঠ ভেসে যায় সহমর্মিতায়। মনে হয়, রাষ্ট্র যেন আমাদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে।
এই সময়টুকুতে আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আমরা ভাবি—এবার হয়তো সত্যিই কিছু বদলাবে। কিন্তু এই বিশ্বাসের আয়ু খুব কম।
ভোটের ফল ঘোষণা হতেই আমরা আবার হারিয়ে যাই। ক্ষমতার চেয়ারে থাকা প্রতিনিধিদের কাছে আমরা তখন অপ্রাসঙ্গিক। যাদের ভোটে তারা নির্বাচিত, সেই মানুষগুলোর উপস্থিতি আর প্রয়োজন হয় না। যোগাযোগের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, প্রতিশ্রুতি আটকে পড়ে বক্তৃতায়, আর আমরা ফিরে যাই সেই চিরচেনা ‘উপেক্ষা’র বাস্তবতায়।
এই বাস্তবতা কাকতালীয় নয়। এটা রাজনৈতিক প্যাটার্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বছরের পর বছর ধরে।
আমরা বহুবার দেখেছি, ভোটের আগে জনগণ ‘অগ্রাধিকার’, আর ভোটের পর জনগণ ‘ঝামেলা’। প্রশ্ন করলেই বিরক্তি, দাবি তুললেই অসহিষ্ণুতা। ধীরে ধীরে আমাদের শেখানো হয়, ‘নীরব থাকাই নিরাপদ’। এর ফল ভোগ করি সবাই।
উন্নয়ন তখন কাগজে হয়, প্রকল্পে হয়, কিন্তু জীবনে পৌঁছায় না। স্বাস্থ্যসেবা নিতে লাইনে থাকি, শিক্ষায় বৈষম্য বাড়ে, কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয় না।
নাগরিক সেবা নিতে গেলে প্রমাণ পাই—রাষ্ট্র আমাদের জন্য অপেক্ষা করে না। এই অবস্থায় আমরা শুধু অবহেলিত নই, রাজনৈতিকভাবে দুর্বল।
কারণ, ক্ষমতা জানে যে ভোটের পর আমাদের হাতিয়ার খুব সীমিত—পাঁচ বছর পর আবার আমাদের দরকার হবে, তার আগে নয়। এই হিসাব থেকেই জন্ম নেয় রাজনৈতিক উদাসীনতা, জবাবদিহিতাহীনতা। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, আমরাও ধীরে ধীরে এটাকে মেনে নিয়েছি।
আমরা বলি, ‘সবাই তো একই’, ‘এতে কিছু হবে না’, ‘চিন্তা করে লাভ কী?’ এই মানসিকতাই আমাদের নাগরিকত্বকে খর্ব করে। আমরা ভোটার থাকি, কিন্তু নাগরিক হয়ে উঠতে পারি না।
এখানেই প্রশ্নটা সবচেয়ে জরুরি হয়ে ওঠে—আমরা কি শুধু ভোট দেওয়ার যন্ত্র?
যদি তা না হয়, তাহলে এই সম্পর্ক বদলাতে হবে। পরিবর্তন কেবল বক্তৃতায় নয়, কাঠামোতে আসতে হবে।
প্রথমত, ভোট-পরবর্তী জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক করতে হবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনগণের সামনে নিয়মিত দাঁড়াতে হবে। গণশুনানি, ওপেন ফোরাম, স্থানীয় পর্যায়ের সংলাপ—এগুলো আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়, বাধ্যতামূলক হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ইশতেহারকে প্রতিশ্রুতি নয়, দায় হিসেবে দেখতে হবে। জনগণ যে ভিত্তিতে ভোট দিয়েছে, তার অগ্রগতি প্রকাশ্যে জানাতে হবে। কী হয়েছে, কী হয়নি—এই স্বচ্ছতা ছাড়া আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।
তৃতীয়ত, রাজনীতিকে আবার মানুষের দিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। ক্ষমতায় গিয়ে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে যদি ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত না করা হয়, তাহলে এই চক্র চলতেই থাকবে। দলগুলোকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, জনগণ ছাড়া রাজনীতি টেকসই নয়।
কিন্তু দায় শুধু ক্ষমতার নয়। আমরাও দায় এড়াতে পারি না। ভোট দিয়ে দায়িত্ব শেষ—এই ধারণা আমাদের দুর্বল করে।
আমরা যদি প্রশ্ন না করি, দাবি না তুলি, সংগঠিত না হই—তাহলে আমাদের উপেক্ষা করাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিক হিসেবে আমাদের অবস্থান ফিরিয়ে আনতেই হবে—স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয় থেকে, গণমাধ্যমে কথা বলে, নাগরিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়ে। কারণ, আমরা যদি নীরব থাকি, তাহলে ক্ষমতা আরও নির্বিকার হবে।
ভোটের আগে যেভাবে আমাদের জড়িয়ে ধরা হয়, আমরা চাই ভোটের পরেও ঠিক সেই মনোযোগ, সেই শ্রবণযোগ্যতা অব্যাহত থাকুক। আমরা চাই, আমাদের কথা শোনা হোক—শুধু প্রয়োজনের সময় নয়, সিদ্ধান্তের সময়েও।
কারণ, জনগণ কোনো দলের সম্পদ নয়, ক্ষমতার হাতিয়ার নয়—জনগণই রাষ্ট্রের ভিত্তি। এই ভিত্তিকে উপেক্ষা করে কোনো রাজনীতিই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
যতদিন এই সত্যটি স্বীকৃতি না পাবে, ততদিন প্রশ্নটা অনিবার্যভাবেই ফিরে আসবে—জনগণ, তুমি কার?
জুবাইয়া ঝুমা, পিআর প্রফেশনাল

