সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন বাড়িয়ে নতুন জাতীয় বেতন-কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়বে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। নতুন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্কের খুব বেশি অবকাশ নেই। দীর্ঘদিন ধরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে; খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ মানুষের আয়কে ক্রমেই চাপে ফেলেছে। ফলে বহু বছর পর বেতন-কাঠামো পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে হতে পারে।
কিন্তু বেতন বাড়ানোর হিসাবটি শুধু কত শতাংশ বেতন বাড়ল, সেখানে শেষ হয় না। আসল হিসাব হলো, সেই বাড়তি আয়ে আগের তুলনায় কতটা বেশি পণ্য ও সেবা কেনা যাবে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতা বলা হয়। শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রার জন্য সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে এই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, জুলাই ২০২৬-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। জুনে এই হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার কমেছে, এটি অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, পণ্যের দাম আগের জায়গায় ফিরে এসেছে। দাম বৃদ্ধির গতি কেবল কিছুটা কমেছে, দাম কমেনি।
এই পার্থক্যটি সাধারণ মানুষের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পণ্যের দাম এক বছরে ১০ শতাংশ বৃদ্ধির পরের বছর সেই পণ্যের দাম আরও ৮ শতাংশ বাড়লে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলা যাবে, কিন্তু ক্রেতার খরচ কমবে না। তার পরিবর্তে আগের বাড়তি দামের ওপর আরও নতুন ব্যয় যুক্ত হবে। ফলে কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব মানুষের সংসার চালানোর সক্ষমতার ওপর জমতে থাকে।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন-কাঠামোর একটি উদ্দেশ্য তাদের আয়কে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। কিন্তু একই যুক্তি বেসরকারি খাতের কর্মীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দেশের কর্মজীবী মানুষের বড় একটি অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তাদের অনেকেরই জাতীয় বেতন-কাঠামোর মতো কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো নেই। বেতন বৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বেসরকারি চাকরিজীবীদের অবস্থা কঠিন। তাদের আয়ের ওপর নির্ভর করে বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, যাতায়াত, খাবার ও ভবিষ্যতের সঞ্চয়। একইসঙ্গে তাদের অনেককে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চাকরির অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে হয়।
এখানে বেতন বৃদ্ধির একটি সহজ হিসাব করা যায়। কারো বেতন বছরে ৫ শতাংশ বাড়ল, কিন্তু একই সময়ে তার পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের গড় বৃদ্ধি যদি তারচেয়ে বেশি হয়, তাহলে কাগজে বেতন বাড়লেও বাস্তবে তার আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে না। এর বিপরীতে আগের জীবনযাত্রা ধরে রাখতেই তাকে সঞ্চয় কমাতে, ঋণ নিতে বা অতিরিক্ত কাজ করতে হতে পারে।
সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে নতুন বেতন-কাঠামো অন্তত একটি কাঠামোবদ্ধ সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করছে। বেসরকারি খাতে এমন ব্যবস্থা না থাকায় মূল্যস্ফীতি বাড়লে কর্মীদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি। ফলে শুধু বার্ষিক ৫ বা ৭ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে।
এর সঙ্গে নতুন বেতন-কাঠামোর আরেকটি অর্থনৈতিক প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। সেটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। মানুষের হাতে বেশি অর্থ গেলে বাজারে চাহিদা বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসতে পারে। কিন্তু উৎপাদন ও সরবরাহ যদি সেই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে কিছু পণ্য ও সেবার দাম আরও বৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।
এ কারণেই বেতন বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারি কর্মীদের আয় বাড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই আয় বৃদ্ধির ফলে বাজারে অতিরিক্ত মূল্যচাপ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও নজরে রাখতে হবে। অর্থনীতিবিদদের একাংশও নতুন বেতন-কাঠামোর ফলে সরকারি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপের কথা বলেছেন।
আরও বড় বিষয় হলো, বাড়তি বাজার-চাহিদার সুফল তখনই সবার কাছে পৌঁছাবে, যখন উৎপাদন বাড়বে এবং সরবরাহব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন, বাসস্থানসহ প্রয়োজনীয় খাতে সরবরাহে সমস্যা থাকলে বাড়তি আয় সহজেই বাড়তি দামে পরিণত হতে পারে। তখন সরকারি চাকরিজীবীরা বেতন বৃদ্ধির কিছুটা সুবিধা পেলেও নির্দিষ্ট আয়ের অন্য মানুষ আরও চাপে পড়তে পারেন।
এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি কার্যকর নীতিগত কাঠামো নিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। সরকার সরাসরি প্রতিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন নির্ধারণ করে দিতে পারে না। প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও ব্যবসার ধরন ভিন্ন। কিন্তু মূল্যস্ফীতি একটি নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেলে বেতন পুনর্বিবেচনা, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন সমন্বয় এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মীদের সুরক্ষার মতো বিষয় নিয়ে একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।
শুধু মাসিক বেতন বাড়লেই জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা আসে না। এমন উদ্যোগের সঙ্গে শ্রমিকের অন্যান্য অধিকারও যুক্ত হওয়া দরকার। নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, ছুটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ও চাকরির নিরাপত্তা একজন মানুষের প্রকৃত আর্থিক নিরাপত্তার অংশ।
সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বেতন বৃদ্ধি ঘুষের বৈধ কারণ হতে পারে না। একজন সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব আইন মেনে সেবা দেওয়া। একইসঙ্গে ঘুষের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ে। সরকারি সেবায় অতিরিক্ত অর্থ দিতে হলে সেটিও এক ধরনের মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করে। তাই বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সাফল্য শুধু নতুন বেতন-কাঠামোর সংখ্যায় মাপা উচিত নয়। মাপতে হবে একজন কর্মী মাস শেষে তার আয় দিয়ে আগের তুলনায় কতটা স্বস্তিতে সংসার চালাতে পারছেন, সেটি দিয়ে।
সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়ানো প্রয়োজন ছিল, হয়েছে। এখন বড় কাজ হলো মূল্যস্ফীতিকে এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনা, যাতে সেই বাড়তি আয় বাজারের বাড়তি দামে হারিয়ে না যায়। একইসঙ্গে বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার পথও তৈরি করতে হবে। কারণ, শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে বেতন কত শতাংশ বাড়ল, তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো মাসের শেষে সেই বেতনে কতটা জীবন চালানো গেল।
মো. আব্বাস: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও যোগাযোগ পেশাজীবী।
[email protected]

