কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন আর শুধু তথ্য খোঁজা কিংবা ভাষা অনুবাদের কাজে সীমাবদ্ধ নেই। পর্যটকদের ভিড় সামলানো, যোগাযোগ সহজ করা, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা বাড়াতেও এর ব্যবহার হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরে পর্যটন এলাকাগুলোতে মানুষের চলাচল বিশ্লেষণ করে অতিরিক্ত ভিড় থেকে তৈরি হতে পারে এমন ঝুঁকি শনাক্ত করা হচ্ছে। ভাষার বাধা দূর করতেও অনুবাদ প্রযুক্তি কাজে লাগানো হচ্ছে। জাপানসহ কয়েকটি দেশে বিদেশি পর্যটকদের জন্য এআইভিত্তিক অনুবাদসেবা চালু হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় বিভিন্ন ভাষায় পর্যটকদের তথ্য দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে চ্যাটবট।
জরুরি প্রয়োজনে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট পর্যটকদের পথ দেখানো ও নিরাপত্তার বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারে। আবার কিছু দেশে নিরাপত্তাবিষয়ক অ্যাপের মাধ্যমে পর্যটকরা অপরাধের ঘটনা জানাতে, জরুরি সহায়তা চাইতে এবং কাছাকাছি পুলিশের অবস্থান জানতে পারেন।
থাইল্যান্ডে পর্যটক ও ট্যুরিস্ট পুলিশের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করতে এবং নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্য দিতে ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো পর্যটক বিপদে পড়লে এআই-সক্ষম পরিধানযোগ্য যন্ত্রের মাধ্যমেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা সম্ভব।
প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নয়। বড় ধরনের ভিড় সামলাতেও এটি কাজে লাগানো হচ্ছে। মানুষের চলাচলের তাৎক্ষণিক তথ্য বিশ্লেষণ করে কোথায় পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে, কোন পথে ভিড় তৈরি হচ্ছে এবং কোথায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা শনাক্ত করা যায়।
ইতালির ভেনিসে পর্যটকের সংখ্যা ও চলাচল পর্যবেক্ষণে ভিড় বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য শুধু ভিড় কমানো নয়, পর্যটকদের চলাচল সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা এবং অতিরিক্ত পর্যটনের কারণে শহরের ওপর তৈরি হওয়া চাপ মোকাবিলা করাও এর লক্ষ্য।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় ড্রোনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পর্যটনকেন্দ্র, সমুদ্রসৈকত, বড় সমাবেশ এবং দুর্গম এলাকায় আকাশপথে নজরদারির কাজে ড্রোন ব্যবহার করা যায়। দুবাইয়ের পর্যটন এলাকা ও পার্ক এবং গ্রিস ও চীনের ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে নিরাপত্তা ও নজরদারির কাজে ড্রোন ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে।
এসব প্রযুক্তির বড় সুবিধা হলো, পর্যটকের অবস্থান ও পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত তথ্য ও সহায়তা দেওয়া যায়। কোনো পর্যটক কোথায় আছেন এবং কী ধরনের সমস্যায় পড়েছেন, তা জানা গেলে কর্তৃপক্ষও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে।
তবে পর্যটনে প্রযুক্তির ব্যবহার মানে শুধু নতুন অ্যাপ বা যন্ত্র চালু করা নয়। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তথ্যের দায়িত্বশীল ব্যবহার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাও প্রয়োজন।
স্মার্ট নজরদারি, অপরাধ শনাক্তকরণ, ভাষাগত সহায়তা, মোবাইল নিরাপত্তা অ্যাপ, ভিড় ব্যবস্থাপনা, প্রতারণা শনাক্তকরণ, জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়া এবং ড্রোন নজরদারি—এসব প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হবে, যখন এগুলো পর্যটন ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক কাঠামোর সঙ্গে যথাযথভাবে যুক্ত করা যাবে।
স্মার্ট পর্যটনের উত্থান
২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক পর্যটনখাতের পরিবর্তনকে মোটামুটি চারটি পর্যায়ে দেখা যায়। ২০১৯ সালে কোভিডের আগের সময়টিতে পর্যটনখাত ছিল শক্তিশালী অবস্থানে। এরপর ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে এই খাতে বড় ধস নামে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পর্যটন দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। আর ২০২৪ সাল থেকে অনেক দেশে পর্যটন আবার মহামারির আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে, কোথাও কোথাও আগের অবস্থাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এই পুনরুদ্ধারের সঙ্গে পর্যটনখাতে প্রযুক্তির ব্যবহারও দ্রুত বেড়েছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে আরও নিরাপদ ও কার্যকর করতে ডিজিটাল সেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দক্ষ জনবল, টেকসই অবকাঠামো এবং তথ্যের দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দেশের পর্যটনখাতের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা, তথ্যপ্রাপ্তি, ভিড় ব্যবস্থাপনা ও জরুরি সেবার মান উন্নত করতে প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে পর্যটকের অভিজ্ঞতা যেমন ভালো হবে, তেমনি পর্যটনকেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হবে।
একটি স্মার্ট ও প্রতিযোগিতামূলক পর্যটন গন্তব্য গড়ে তুলতে সাশ্রয়ী মূল্য, মানসম্মত সেবা, সেবার উৎকর্ষ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার জরুরি।
সন্তোষ কুমার দেব: অধ্যাপক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

