কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যাংকআল্টিমাসের মালিকানা নিয়ে লিডস করপোরেশন লিমিটেডের সঙ্গে খান আখতার আলমের আইনি বিরোধ ২০২৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়িয়েছে। মামলাটি দেওয়ানি আপিল নম্বর ৪৬/২০২৫ হিসেবে আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ছিল। লিডস করপোরেশন জানিয়েছে, ২৭ জুলাই ২০২৬ আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এ মামলায় রায় দিয়ে নিম্ন আদালতের ব্যাংকআল্টিমাস নিলাম ও ক্রোকসংক্রান্ত আদেশ বাতিল করেছে।
এর আগে ২০২৪ সালে লিডসের ব্যাংক হিসাব, ব্যাংকআল্টিমাস সফটওয়্যার এবং লিডস টাওয়ার নিলামের বিষয়টি আদালতের আদেশে এগোয়। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ৯ জুন ২০২৪ সালের রায়ে এ-সংক্রান্ত মামলার নথি ও আদেশের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
মামলাটির একটি পর্যায় ছিল প্রথম বিবিধ আপিল নম্বর ১৪৪/২০২৪ এবং এর সঙ্গে দেওয়ানি রুল নম্বর ১১৩(এফএম)/২০২৪। আদালতের নথি অনুযায়ী, মূল বিরোধের সূত্র ১৯৮১ সালের দেওয়ানি মামলা নম্বর ৪৭৬। খান আখতার আলম ওই মামলা করেছিলেন পাওনা আদায়ের দাবিতে। পরবর্তী সময়ে মামলাটি আপিল পর্যায়ে যায় এবং ২০১০ সালের ১২ আগস্ট ডিক্রি হয়।
ডিক্রির অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় পাওনা আদায়ের জন্য নির্বাহী মামলা করা হয়। প্রথমে মামলাটি দেওয়ানি নির্বাহী মামলা নম্বর ৭/২০১৩ হিসেবে চললেও পরে ঢাকা জেলা জজ আদালতের অধীনে স্থানান্তরিত হয়ে ২০১৮ সালে দেওয়ানি নির্বাহী মামলা নম্বর ৭/২০১৮ হিসেবে চলতে থাকে। আদালতের ২০২৪ সালের নথিতে ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭ কোটি ২৭ লাখ ৫৫ হাজার ৫৩৮ দশমিক ৭৮ মার্কিন ডলার অথবা পরিশোধের সময় প্রচলিত বিনিময় হারে সমপরিমাণ টাকা দাবির তথ্য রয়েছে।
এই পাওনা আদায়ের জন্য খান আখতার আলম লিডসের ব্যাংক হিসাব জব্দ, ব্যাংকআল্টিমাস সফটওয়্যার নিলামে বিক্রি এবং লিডস টাওয়ার নিলামের আবেদন করেন। ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালত ২০২৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ৬৮ নম্বর আদেশে আবেদনগুলো মঞ্জুর করেন।
আদালতের ওই আদেশে লিডসের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে সেখানে থাকা অর্থ ডিক্রিধারীর হিসাবে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকআল্টিমাস জব্দ করে নিলামে বিক্রি এবং লিডস টাওয়ার জব্দ করে নিলামে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়। ব্যাংকআল্টিমাসের নিলামের তারিখ ২৭ মার্চ এবং লিডস টাওয়ারের নিলামের তারিখ ২৩ এপ্রিল নির্ধারণ করা হয়েছিল।
লিডস ওই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যায়। ২০২৪ সালের ৯ জুন হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে বলা হয়, লিডসের বিরুদ্ধে থাকা ডিক্রি বহাল ছিল এবং ডিক্রিধারীর পাওনা আদায়ের জন্য নির্বাহী আদালতে সম্পত্তি বিক্রির আবেদন করার সুযোগ ছিল। আদালত দেওয়ানি কার্যবিধির ২১ নম্বর আদেশের ৪৬ ও ৬২ নম্বর বিধির উল্লেখ করে ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি জব্দ এবং নিলামসংক্রান্ত নির্বাহী আদালতের আদেশে আইনগত ত্রুটি খুঁজে পায়নি।
ব্যাংকআল্টিমাসের নিলাম নিয়েও আদালতের নথিতে তথ্য রয়েছে। সেখানে পাঁচ কোটি টাকার প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করা হয়। লিডসকে এর চেয়ে বেশি মূল্য দিতে সক্ষম ক্রেতা আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আদালতের নথি অনুযায়ী, লিডস এমন ক্রেতা হাজির করতে পারেনি এবং পরবর্তী আদেশে পাঁচ কোটি টাকার মূল্য নিশ্চিত করা হয়।
একই বিরোধে ২০২৪ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট বিভাগ দেওয়ানি রুল নম্বর ১১৫(কন)(এফ)/২০২৪-এর রায় দেয়। ওই মামলাটি ১৯৮১ সালের দেওয়ানি মামলা নম্বর ৪৭৬-এর রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে ৪ হাজার ৮৬৫ দিনের বিলম্ব মওকুফের আবেদন নিয়ে ছিল।
২০২৫ সালের ১৯ জুনের সুপ্রিম কোর্টের কার্যতালিকায় দেওয়ানি আপিল নম্বর ৪৬/২০২৫ লিডস করপোরেশন বনাম খান আখতার আলম ও অন্যদের নামে ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের জুলাই ও আগস্টের কার্যতালিকাতেও মামলাটি ছিল।
লিডস করপোরেশন জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ২৭ জুলাই আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ মামলাটির রায় দেয়। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, নিম্ন আদালতের নিলাম ও ক্রোকসংক্রান্ত আদেশ বাতিল হওয়ায় ব্যাংকআল্টিমাসের মালিকানা ও মেধাস্বত্ব নিয়ে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে।
এই আইনি বিরোধের মধ্যেই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ওয়েস্টার্ন গ্রুপ লিডস করপোরেশনের শতভাগ শেয়ার অধিগ্রহণ করে। ফলে লিডসের মালিকানা পরিবর্তন হলেও ব্যাংকআল্টিমাস নিয়ে আদালতের মামলা চলতে থাকে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের রায়ের পর লিডস জানায়, সফটওয়্যারটির মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতার অবসান হয়েছে।
লিডসের আর্থিক সংকটের বিষয়ে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ২০১৮ সাল থেকে কর্মীদের বেতন অনিয়মিত হওয়ার তথ্য উঠে আসে। সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে ওই প্রতিবেদনে কর্মীদের মোট পাওনা প্রায় ৪০ কোটি টাকা হওয়ার কথা বলা হয়।
প্রতিবেদনে লিডসের সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বেতন তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত বিলম্বিত হতো। সাবেক কর্মকর্তা আরিফুর আমরান চৌধুরী তার নিজের পাওনা ১৭ লাখ টাকার বেশি বলে জানিয়েছিলেন।
প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা এস এম সাইফুর রহমানের বক্তব্য ছিল, লিডস প্রতি মাসে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করত এবং কর্মীদের মাসিক বেতন ছিল প্রায় ২ কোটি টাকা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অর্থের একটি বড় অংশ মালিকপক্ষের ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে অর্থ বিভাগ থেকে জানানো হতো।
পরবর্তী সময়ে লিডসের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নথি পর্যালোচনা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাব জব্দ হওয়ার আগে লিডস মাসে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা পেত এবং কর্মীদের বেতন বাবদ ব্যয় ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা। তার দাবি ছিল, নথিতে অর্থ থাকার কথা দেখা গেলেও সেই অর্থ পাওয়া যাচ্ছিল না। অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলেও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
তবে অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া বা দেশের বাইরে পাঠানোর অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য নথিতে চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
লিডসের সংকটের সঙ্গে ব্যাংকআল্টিমাসের বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় এর প্রভাব প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক ব্যাংকগুলোর ওপরও পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, লিডসের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রযুক্তি কর্মী প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ প্রযুক্তি কর্মীদের ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কর্মী সংকট নিয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
লিডস বর্তমানে জানিয়েছে, ব্যাংকআল্টিমাস দেশের ১৩টি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি নতুন ফিঙ্গিনএক্স নামে একটি সার্বজনীন ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরির কথাও জানিয়েছে। লিডসের নতুন মালিকানার সঙ্গে আরেকটি বিষয় যুক্ত হয়েছে। ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেডের নামে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অন্যদের বিরুদ্ধে সাতটি রিট মামলা রয়েছে। মামলাগুলোর নম্বর ৭৯৫৫/২০২০ থেকে ৭৯৬১/২০২০ পর্যন্ত।
সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশ্য কার্যতালিকায় মামলাগুলোর উপস্থিতি পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে সাতটি মামলা একসঙ্গে কার্যতালিকায় ছিল। ২০২৬ সালেও বিভিন্ন তারিখের কার্যতালিকায় এসব মামলার উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মামলা থাকা থেকে কর ফাঁকি বা অন্য কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয় না। এসব মামলার প্রকৃত বিষয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বক্তব্য, ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বক্তব্য এবং মামলাগুলোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আলাদাভাবে পর্যালোচনা না করে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন দাবি করা যায় না।
লিডসের ক্ষেত্রে বর্তমানে দুটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমটি হলো ব্যাংকআল্টিমাসের মালিকানা নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয়টি হলো অতীতের আর্থিক সংকটের পর নতুন মালিকানায় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা।
একটি ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা গ্রাহকের হিসাব, লেনদেন, ঋণ, আমানত, সুদ, হিসাব সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে এ ধরনের ব্যবস্থা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, আর্থিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি কর্মী এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
লিডসের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের আদালতের নথিতে ব্যাংক হিসাব জব্দ, ব্যাংকআল্টিমাস নিলাম এবং লিডস টাওয়ার নিলামের প্রক্রিয়া দেখা যায়। ২০২৬ সালে লিডসের প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে সেই নিলাম ও ক্রোকসংক্রান্ত আদেশ বাতিল হয়েছে।
এখন লিডসের সামনে মূল প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন মালিকানার অধীনে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, ব্যাংকআল্টিমাসের প্রযুক্তি রক্ষণাবেক্ষণে কতজন অভিজ্ঞ কর্মী রয়েছেন, সফটওয়্যারটির উন্নয়নে কী ধরনের বিনিয়োগ হচ্ছে এবং ব্যাংকগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কী।
ওয়েস্টার্ন গ্রুপের অধীনে লিডসের নতুন পর্যায় শুরু হয়েছে। ব্যাংকআল্টিমাসের মালিকানা নিয়ে আপিল বিভাগের রায়ের পর প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আইনি অনিশ্চয়তা দূর হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে লিডসের আগের আর্থিক সংকট, কর্মীদের বকেয়া, নিলাম পর্যন্ত গড়ানো মামলা এবং নতুন মালিকানার সঙ্গে যুক্ত ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসংক্রান্ত মামলাগুলো প্রতিষ্ঠানটির করপোরেট পরিচালনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।
বিশেষ করে যেসব ব্যাংক ব্যাংকআল্টিমাস ব্যবহার করছে, তাদের জন্য সফটওয়্যারটির মালিকানা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা কাঠামো, প্রযুক্তি কর্মী, তথ্য নিরাপত্তা, সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিকল্প ব্যবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ একটি ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সংকট শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক বিষয় হয়ে থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম, গ্রাহকের লেনদেন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা। লিডসের ২০২৪ সালের আদালত নথি এবং ২০২৬ সালের আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।

