ঈদ মানে যে খুশি, সে তো আমরা জেনে ফেলি বাল্যকালেই। রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ—এই গান এখন কতটা গাওয়া হয় জানি না, আমাদের বাল্যকালে খুবই শোনা যেত।
তখন টেলিভিশন ছিল না, রেডিও ছিল, তাতেই সন্ধ্যা থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত নানা সুরে ও বাণীতে অবিরাম এই খবর আসত কানে। দৈনিকের ঈদ সংখ্যাগুলো (বইয়ের আকারে নয়, পত্রিকার সাইজেই) কিছুটা রঙিন হতো সবুজ ও সাদায় এবং তাদের সব কটিতেই অনেক অনেক কবিতা থাকত ঈদের ওপর।
এখন টেলিভিশন এসেছে নানা রকমের, দৈনিকগুলো রঙিন হয়েছে অনেক অধিক পরিমাণে। এখন আর খুশির ঈদের কথা গান গেয়ে না বললেও চলে। পণ্যের বিজ্ঞাপনই জানিয়ে দেয় উৎসব আসছে, বলে দেয় প্রস্তুত হতে, ক্রয়ের জন্য। ঈদ এখন খুবই বাণিজ্যকবলিত। হতেই হবে। আমরা কি উন্নত হচ্ছি না? প্রবেশ করছি না মুক্তবাজারে?
ঈদের প্রধান দিকটা বাণিজ্যের নয়, উৎসবেরই এবং সেই উৎসবটা সামাজিক। মানুষ একে অপরের সঙ্গে মেলে, নিজের ব্যক্তিগত, এমনকি পারিবারিক গণ্ডি থেকেও বের হয়ে যায়। আমাদের বাল্যকালে এই সামাজিকতাটাই ছিল প্রধান।
আমরা নতুন জামাকাপড় পেতাম, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যেতাম। খাওয়া-দাওয়ার আকর্ষণ অবশ্যই ছিল, থাকতেই হবে, কিন্তু বুঝি আর না বুঝি আসল টানটা ছিল আত্মীয়তার। এখন সেটা যে কমেছে তাতে সন্দেহ প্রকাশের সুযোগটা কোথায়?
মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে। লোকে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। প্রতিযোগিতা আগেও ছিল, কিন্তু এখন সেটা গগনস্পর্শী। পরিবারের সঙ্গে পরিবারের, একই পরিবারের একাংশের সঙ্গে অপরাংশের দ্বন্দ্ব, বিরোধ, প্রতিযোগিতা প্রায়শই উৎকট হয়ে ওঠে। যাতায়াতও কষ্টকর বৈকি। যানবাহনের সুযোগ সংক্ষিপ্ত, যানজট ভয়ঙ্কর। ইচ্ছা থাকলেও যাওয়া হয় না।
একটা বৃত্তের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছি। বয়সকালে আমি নিজে থাকতাম বিশ্ববিদ্যালয় পাড়াতে। আব্বা-আম্মা থাকতেন পুরান ঢাকাতে। ঈদের দিন বিকালের দিকে আমার স্ত্রী ও আমি যেতাম যখন আব্বা-আম্মার সঙ্গে দেখা করতে। তখন টের পেতাম ঈদ আসলে এসেছে ওইসব পুরোনো রাস্তা ও আবাসভূমিতে, যেখানে দু’পাশ থেকে গান বাজছে, ছেলেমেয়েরা সবাই রঙিন হয়ে চলাফেরা করছে, বয়স্করা জড়িয়ে ধরছে একে অপরকে, সর্বত্রই প্রাণ, সবার মধ্যেই টগবগে জীবন। আমরা বুঝতাম এবং নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতাম, ঈদ দেখতে হলে এখানে আসতে হয়।
এখন আমার পিতা-মাতা জীবিত নেই। মায়ের সঙ্গে যখন দেখা করতে যেতাম, তখন দেখতাম আগের সেই প্রাণ আর নেই। আমার নিজের দেখার চোখ বদলেছে, এটা তো অবশ্যই সত্য, কিন্তু এত বেশি ভিড় বেড়েছে পুরান ঢাকায়, এতই জনাকীর্ণ পথঘাট যে আগের সেই সামাজিকতাটা অনেকটা চাপা ও ঢাকা পড়ে গেছে। রুদ্ধশ্বাস দশা।
সামাজিকতা এখন বিপদের মুখে পড়েছে। ঈদের উৎসব যখন সামাজিক ও সর্বজনীন হতে চায়, তখন সামাজিকতার ওই বিপদগ্রস্ত দিকটা বেশ পরিষ্কার হয়ে ওঠে। উৎসবের আলো অন্ধকারটাকে ধরিয়ে দেয়। দুই কারণে ঘটেছে এই বিপদ। একটি আত্মকেন্দ্রিকতা, অপরটি বৈষম্য। এরা যে পরস্পরবিচ্ছিন্ন তা নয়, একেবারেই সংলগ্ন বটে।
আত্মকেন্দ্রিকতাটা যখন-তখন এবং অতিঅনায়াসে চোখে পড়ে। প্রকাশটা খুবই পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে, যখন কারো মৃত্যু উপলক্ষে সমবেত হই। সেখানে খাবার-দাবারের একটা আয়োজন থাকে তো বটেই, কেন থাকে তার ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু সেই ব্যাখ্যাতে যাওয়ার দরকার নেই। তার চেয়েও ব্যাপক হারে যা ঘটে সেটা হলো মৃত মানুষটিকে ভুলে গিয়ে নিজেদের নিয়ে আলোচনা। কি মহিলা মহলে, কি পুরুষদের ভেতরে কথাবার্তা চলে নিজেদের চিন্তা, দুশ্চিন্তা, অর্জন, সন্তান-সন্ততির উন্নতি, এমনকি কার কি অসুখ-বিসুখ ও কোথায় চিকিৎসা তা নিয়েও।
রাজনীতিও চলে আসে। তা নিয়ে তর্ক-বিতর্কের উপক্রমও ঘটে। কিন্তু যিনি মারা গেছেন তিনি থাকেন উপেক্ষিত, পরিণত হন উপলক্ষে।
এর চেয়েও বড় সত্য হলো বৈষম্য। ঈদ উপলক্ষে এই বৈষম্য যেভাবে উন্মোচিত হয়ে যায়, তেমনভাবে বোধ করি আর কখনই ঘটে না। বিশেষ করে অভিজাত এলাকাগুলোতে যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা মর্মবিদারক। বিত্তবানরা গাড়িতে করে আসেন, তাদের ড্রাইভাররা নামাজে কীভাবে যোগ দেবে তা ড্রাইভারদের নিজ নিজ দুশ্চিন্তা, মালিকদের নয়।
ড্রাইভাররা তবু ভাগ্যবান, মসজিদের চারপাশে যে অসংখ্য হতদরিদ্র মানুষ জড়ো হয়, ফিতরা বা এমনি কিছু পয়সা পাবে এই আশায় হাত পেতে থাকে, পরস্পরের ভেতর ঠেলাধাক্কা বাধায়। তাদের জন্য মসজিদের ভেতরে ঢোকাটা অপ্রাসঙ্গিক। তাদের আশার কেন্দ্রবিন্দু একটাই, সহৃদয়তার সম্ভাবনা।
কেবল ঈদের দিনে কি? রোজার শুরু থেকেই এই ভিড় শুরু হয়। গ্রাম থেকে চলে আসে অসহায় মানুষ। থাকে রাস্তায়। তারা কী খায়, কেমন করে থাকে খোঁজ রাখার অবকাশ কোথায় ব্যস্ত ও বিচ্ছিন্ন মানুষদের? না, কেউ খোঁজ করে না। ইসলাম ধর্মের ঘোষিত একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য যে সাম্য তা কার্যকর থাকে না।
বিচ্ছিন্নতা ও বৈষম্য দুটোই এসেছে পুঁজিবাদ থেকে। দেশে উন্নতি যে একেবারেই হয়নি তা নয়, কিছুটা অবশ্যই হয়েছে। অস্বীকার করবে কোন অন্ধ? কিন্তু এই উন্নতির চরিত্রটা হচ্ছে পুঁজিবাদী, যা একদিকে মানুষকে পরস্পরবিচ্ছিন্ন এমনকি আত্মবিচ্ছিন্ন করে, অন্যদিকে নির্মম হাতে বৃদ্ধি করে চলে বৈষম্য।
ওই উন্নতির ফাঁদে আমরা পড়েছি। ফলে সামাজিকতা বিপদগ্রস্ত হচ্ছে। ঈদের উৎসব এসে এই সত্যটাকে সবলে এবং নতুনভাবে আচ্ছাদনমুক্ত করে দেয়। কিন্তু সামাজিকতা তো অত্যাবশ্যক। মানুষ তো মানুষ থাকবে না, যদি সে সামাজিক না হয়, পরিণত হবে হয় যন্ত্রে, নয়তো পশুতে। কোনোটাই তার মানুষ্যত্বের জন্য সংরক্ষক হতে পারে না। হচ্ছেও না।
আমরা সামাজিকতা চাই। খুব বেশি করেই চাই, কেননা তার ভয়াবহ অভাব দেখা দিয়েছে। এই সামাজিকতার প্রকাশ ও বিকাশে উৎসবের ভূমিকাটাকে খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই। সেইসব উৎসব দরকার যেগুলো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক নয়, সামাজিক। ঈদ ও পূজা ধর্মীয় উৎসব বটে। কিন্তু একটা সময় আমাদের এই বাংলাদেশেই ছিল যখন উভয় উৎসবেই অন্যরা যোগ দিত, ঈদে হিন্দুরা দাওয়াত পেত, পূজায় মুসলমানরা দেবদেবীর মূর্তি দেখতে যেত, প্রসাদও পেয়ে যেত। এখন তেমনটা নেই।
ধর্মীয় উৎসবের বাইরে যে সর্বজনীন দিনগুলো রয়েছে, যেমন পহেলা বৈশাখ, নবান্ন, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস-সেগুলো ধর্মনিরপেক্ষ, পরিপূর্ণরূপেই অসাম্প্রদায়িক ও ইহজাগতিক। তাদের পক্ষে সর্বজনীনভাবে সামাজিক হওয়ার কথা। কিন্তু হয় কি? না, হয় না।
পহেলা বৈশাখ মধ্যবিত্তের জন্য যতটা আনন্দ নিয়ে আসে, বিপন্ন কৃষকের জন্য তার একাংশও আনতে পারে না। উপায় নেই আনবার। একুশে ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষিত মানুষ শহীদ মিনারে যায়, অন্যরা দূরেই থাকে। নবান্নও এখন আর সকল মানুষের অনুষ্ঠান নেই, এমনকি কৃষির সঙ্গে যুক্ত মানুষদেরও নয়। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস এলে নতুন করে পুরোনো সত্যটাকেই জানা হয়ে যায়, কিছু মানুষের জন্য স্বাধীনতা এসেছে, মুক্তি আসেনি জনগণের।
আমরা জোর গলায় বলতে পারি এবং বলবও যে, সামাজিকতা চাই। চাই বিদ্যুৎ, চাই শিক্ষা। দরকার উৎসবের। প্রয়োজন আনন্দের। কিন্তু সে তো আসবে না, আসছেও না, যতদিন আসার পথের প্রতিবন্ধক দূর না হয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রথম ও প্রধান প্রতিবন্ধকটি হচ্ছে অর্থনৈতিক; যাকে আমরা পুঁজিবাদ বলে চিহ্নিত করতে পারি, তাকে চিনবার সুবিধার জন্য। কিন্তু অর্থনীতির সঙ্গে রাজনীতিও আছে। খুব ভালোভাবেই জড়িয়ে রয়েছে। রাজনীতি মানে রাষ্ট্রক্ষমতা। সেই রাষ্ট্রক্ষমতাই আসলে নিয়ামকের ভূমিকা ধারণ করে বসে রয়েছে, অনড়ভাবে। অনেককাল আমরা পরাধীন ছিলাম। রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল বিদেশিদের হাতে।
এখন তা চলে এসেছে স্বদেশিদের হাতে। একেই, এই চলে আসাটাকেই বলছি স্বাধীনতা। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতা তো জনগণের কাছে যায়নি, জনগণ রাষ্ট্রের কর্তা হয়নি। কর্তা একটি বিশেষ শ্রেণি।
এই শাসকশ্রেণিই বিভিন্ন নামে ও পোশাকে কর্তৃত্ব করছে এবং বিচ্ছিন্ন ও বৈষম্য বৃদ্ধির সর্বনাশা কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এদের জন্য প্রধান বিবেচ্য বিষয় জনগণের দুর্ভোগ ও যন্ত্রণা নয়, প্রধান বিষয় হলো নির্বাচন, অর্থাৎ ক্ষমতায় যাওয়া না-যাওয়া। এরা তাই সংলাপ করে নির্বাচনের আয়োজন নিয়ে; সংলাপে বসে না জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের উপায় ও পদ্ধতি নিয়ে।
দেশে সুশীল সমাজ আছে, তারাও যে আসলে এই শাসকশ্রেণির অপরিহার্য অংশ তা অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যায় যখন দেখা যায় তাদের প্রধান উদ্বেগটা হচ্ছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের আবশ্যকতা নিয়ে। শাসকশ্রেণির বিদেশি মুরব্বিদেরও বিবেচ্য বিষয় ওইটাই, তথাকথিত সুষ্ঠু নির্বাচন। জনগণ মরল কি বাঁচল, তা নিয়ে কারো মাথাতেই কোনো ধরনের ব্যথা নেই।
সমস্যাটা তো শাসকশ্রেণির কোন অংশ নির্বাচিত হবে সেটা নয়, সমস্যাটা হচ্ছে শাসকশ্রেণিকে কীভাবে পরাভূত করে মানুষের সামাজিকতা তথা মনুষ্যত্বকে রক্ষা করা যাবে সেটাই। সেদিকটাকে উপেক্ষা করে যতই ঢাকঢোল বাজানো হোক না কেন, তাতে নতুন একটা নির্বাচনী উৎসব (আশা করব সহিংস নয়) হয়তো পাব, তাকে তামাশাও বলা যাবে, কিন্তু তাতে করে মানুষ্যত্বকে রক্ষা করার পথে আমরা এগোতে পারব না।
এগোনোর পথটা স্পষ্ট। সেটা হলো সমাজকাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা। অর্থাৎ সমাজকে এমনভাবে গণতান্ত্রিক করে তোলা যাতে মানুষে মানুষে মৈত্রী প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সব মানুষই মুক্ত হবে।
তখন আমাদের উৎসবগুলো হবে সর্বজনীন, সবাই হয়তো সব উৎসবে আসবে না, কিন্তু সবার জন্যই দরজা থাকবে উন্মুক্ত, সুযোগ থাকবে প্রসারিত। সেজন্য রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল দরকার হবে। তেমন রাজনীতির ও দলের যাদের অঙ্গীকার হবে বিদ্যমান শাসকশ্রেণিকে হটিয়ে রাষ্ট্রকে জনগণের করা এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা ও বৈষম্য যত বেশি পরিমাণে পারা যায় সরিয়ে ফেলা।

