Homeমতামত‘শিকারি সাংবাদিকতা’ এক বিষফোঁড়া

‘শিকারি সাংবাদিকতা’ এক বিষফোঁড়া

-

বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের অববাহিকায় বিশ্লেষণধর্মী সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রে সচেতনতা সৃষ্টি এবং জনমত গঠনের লক্ষ্য নিয়ে সম্প্রতি পালিত হলো বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, বরং নাগরিক চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে সাংবাদিকতার যে বিস্তৃতি ঘটেছে, তার ভেতরেই জন্ম নিয়েছে এক নতুন সংকট—‘শিকারি সাংবাদিকতা’।

প্রিন্ট মিডিয়াকে ছাড়িয়ে অনলাইনভিত্তিক ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিস্তার যেমন সংবাদকে সহজলভ্য করেছে, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীনতা ও প্রতিযোগিতার চাপে একাংশের সাংবাদিকতা হয়ে উঠেছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, পক্ষপাতদুষ্ট ও আক্রমণাত্মক।

‘শিকারি সাংবাদিকতা’ বলতে মূলত সেইসব কার্যক্রমকে বোঝায়, যেখানে সংবাদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ব্যক্তি, মত বা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। ফটোকার্ড দিয়ে ট্যাগিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ভিডিও তৈরি, বিকৃত তথ্য উপস্থাপন ও ভিউ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে চটকদার শিরোনাম এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এর ফলে প্রকৃত সাংবাদিকতা আড়ালে পড়ে যাচ্ছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

অ্যান্টোনিও গ্রামসি তার প্রিজন নোটবুকসে উল্লেখ করেছিলেন, ‘কালচারাল হেজিমনি তৈরিতে মিডিয়া মুখ্য ভূমিকা পালন করে।’ এই তত্ত্ব আজকের বাস্তবতায় আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যখন মিডিয়া নিজেই পক্ষপাতদুষ্ট বা অপব্যবহৃত হয়, তখন তা সমাজে ভুল চেতনা, বিভাজন ও সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

শিকারি সাংবাদিকতার অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় অনেক পোর্টাল চটকদার ও বিভ্রান্তিকর শিরোনাম ব্যবহার করে সংবাদ পরিবেশন করছে। বিশেষ করে বিরোধীমত দমন, নারী চরিত্র হনন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দলীয় কোন্দল উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে এর সক্রিয়তা লক্ষণীয়।

অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশ করে হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগও এখন অস্বাভাবিক নয়। সম্প্রতি দেশের ছাত্র-সংসদ নির্বাচনের সময় নারী প্রার্থী ও কিছু শিক্ষককে নিয়ে প্রতিবেদনের নামে যেসব কনটেন্ট প্রকাশিত হয়েছে, তা শিকারি সাংবাদিকতার বড় উদাহরণ।

তথ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা প্রায় ৩৮৮টি। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরও ৬২টি নতুন পোর্টাল নিবন্ধন পেয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের পোর্টালের সংখ্যা অনেক বেশি। প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় যেকেউ ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারছে। প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল সংখ্যক পোর্টালে প্রকৃত প্রশিক্ষিত সাংবাদিক কতজন আছেন? অন্যদিকে সাংবাদিকতা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী অনেকেই পেশাটির ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা ও কম বেতনের কারণে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। ফলে একদিকে যেমন অপেশাদারদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে, অন্যদিকে প্রকৃত মেধাবীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

এর প্রভাব পড়ছে জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায়। কারণ, একজন সাংবাদিক কেবল সংবাদ পরিবেশন করেন না; তিনি সমাজের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ ভাবনার নির্মাতা। যে অর্থে সাংবাদিককে বুদ্ধিজীবীও বলা হয়।

বিশেষ করে ২০১৮ সালের পর থেকে এবং সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এ ধরনের অপ-সাংবাদিকতা আরও বিস্তার লাভ করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র-সংসদ নির্বাচন চলাকালে নারী প্রার্থী ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ভুয়া সংবাদ, চরিত্রহনন ও সাইবার হয়রানির ঘটনা বেড়ে যায়। বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম ট্রেন্ড ২০২৩ অনুযায়ী, ২০২২ সালে রিপোর্টকৃত সাইবার অপরাধের ৫২ শতাংশই ছিল সাইবার বুলিং। (প্রথম আলো, ১০ অক্টোবর ২০২৪)

একইসঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের তথ্যমতে, দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার শারীরিক, মানসিক, যৌন বা অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে মানসিক সহিংসতার একটি বড় উৎস হয়ে উঠেছে অনলাইনভিত্তিক অপ-সাংবাদিকতা ও ভুয়া ফটোকার্ড।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সারাদেশে অন্তত দুই হাজার শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় ৮০০ জন আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

এসব সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি এক গভীর সামাজিক সংকটের প্রতিফলন, যেখানে অপপ্রচার ও মব সৃষ্টিতে শিকারি সাংবাদিকতা বড় ভূমিকা রাখছে।

বর্তমানে প্রযুক্তির অবাধ বিস্তারের ফলে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করা সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে প্রয়োজন কঠোর নীতিমালা, নিয়মিত মনিটরিং ও অনিয়ন্ত্রিত নিবন্ধন প্রক্রিয়া বন্ধ করা। পাশাপাশি গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের নৈতিকতা, পেশাগত মান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ। কিন্তু সেই দর্পণ যদি বিকৃত হয়, তবে সমাজও নিজের প্রতিচ্ছবি সঠিকভাবে দেখতে পায় না। তাই ‘শিকারি সাংবাদিকতা’ রোধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এর বিষফোঁড়া আরও গভীর সংকট সৃষ্টি করবে।

 

মনির হোসেন: প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

LATEST POSTS

দেড় কোটি ডলার ক্ষতিপূরণের দাবিতে স্যামসাংয়ের বিরুদ্ধে দুয়া লিপার মামলা

দক্ষিণ কোরীয় প্রতিষ্ঠান স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের বিরুদ্ধে ১৫ মিলিয়ন ডলারের (দেড় কোটি) ক্ষতিপূরণ মামলা ঠুকেছেন জনপ্রিয় আলবেনীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ পপ তারকা দুয়া লিপা।স্যামসাংয়ের টিভির মোড়কে বিনা...

দেশের অর্থনীতিতে ‘ভূমিকম্পের মতো’ ধাক্কা দিতে পারে ইরান যুদ্ধ

বিশ্বের বড় ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ধাক্কা তেলের বাজার, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন, প্রবাসী শ্রমবাজার ও...

‘মাইনাস ২-৩ ডিগ্রিতে আগে কখনো শুটিং করিনি’

চঞ্চল চৌধুরী এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনটি নতুন সিনেমা নিয়ে। সিনেমাগুলো হলো—রেদওয়ান রনির 'দম', তানিম নূরের 'বনলতা এক্সপ্রেস' এবং লিসা গাজীর 'শাস্তি'। এর মধ্যে...

মারা গেছেন প্রয়াত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির নাতনি তাতিয়ানা

প্রয়াত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির নাতনি তাতিয়ানা শ্লসবার্গ (৩৫) ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।আজ বুধবার তাতিয়ানার পরিবারের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে এএফপি।জন এফ...

Most Popular