Homeমতামতফলাফল কেবল সংখ্যা, জীবন তারচেয়েও অনেক বড়

ফলাফল কেবল সংখ্যা, জীবন তারচেয়েও অনেক বড়

-

আজ বাংলাদেশের লাখো শিক্ষার্থীর জীবনে একটি বিশেষ দিন। প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল। কারো ঘরে আনন্দ, কারো চোখে স্বস্তির জল, আবার কোথাও হয়তো নেমে এসেছে নীরবতা। কেউ প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করেছে, কেউ পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত ফলের চেয়ে কম, আবার কেউ হয়তো আজ নিজেকে ব্যর্থ ভাবতে শুরু করেছে।

কিন্তু ফল প্রকাশের এই দিনে সবচেয়ে জরুরি যে কথাটি মনে রাখা দরকার তা হলো, একটি নম্বর কখনোই একজন মানুষের পুরো জীবন, মেধা কিংবা সম্ভাবনাকে নির্ধারণ করে না।

এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। সার্বিক পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ পয়েন্ট।

এই সংখ্যাগুলো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলাফলের ওঠানামা নিয়ে বিশ্লেষণও প্রয়োজন। কেন পাসের হার কমল, কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ল, শিক্ষার মান কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, পরীক্ষা পদ্ধতি কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্ন নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে।

কিন্তু আজকের দিনটি শুধু পরিসংখ্যানের দিন নয়, এমন কিছু কিশোর-কিশোরীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যারা এই বয়সেই নিজেদের সাফল্য বা ব্যর্থতার একটি কঠিন সংজ্ঞার মুখোমুখি হচ্ছে।

আমাদের সমাজে একটি প্রবণতা দীর্ঘদিনের—পরীক্ষায় ভালো ফল করলে বলি, ‘ছেলেটা খুব মেধাবী’; আর ফলাফল প্রত্যাশা মতো না হলে সহজেই বলে ফেলি, ‘ও পড়াশোনায় ভালো না’।

কিন্তু সত্যিই কি তাই? একজন শিক্ষার্থী কি তার পরীক্ষার খাতায় লেখা কয়েকটি সংখ্যার সমান? একজন ১৬ বা ১৭ বছরের কিশোর-কিশোরীর মেধা, সৃজনশীলতা, কৌতূহল, নেতৃত্বের গুণ, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা কি কয়েকটি সংখ্যায় মাপা সম্ভব? অবশ্যই নয়।

তারপরও আমরা সন্তানদের এমন একটি প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দিই, যেখানে জিপিএ-৫ যেন সাফল্যের একমাত্র সনদ। কে কত পেল, কে জিপিএ-৫ পেল, কে গোল্ডেন জিপিএ পেল, কে কোন কলেজে ভর্তি হবে, কে কার চেয়ে ভালো করেছে—এসব নিয়ে শুরু হয় তুলনা।

ফল প্রকাশের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের ছবি, অভিনন্দন, ফুল, কেক ও সাফল্যের গল্পে ভরে যায়। এগুলো আনন্দের এবং অবশ্যই উদযাপনের যোগ্য। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালে এমন অনেক শিক্ষার্থীও থাকে, যারা নিজের ফলাফল নিয়ে ভীষণ হতাশ। কেউ হয়তো ভাবছে, ‘আমি কি ব্যর্থ?’

এখানেই আমাদের থামতে হবে। একজন সন্তানের ফলাফল দেখে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, ‘কত পেয়েছ?’ প্রথমেই দেখা উচিত, তার মানসিক অবস্থাটা কেমন। কারণ, ফলাফল খারাপ হওয়ার পর একটি শিশুর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও পরিবারের সমর্থন। তখন তাকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা নয়, তার পাশে দাঁড়ানো জরুরি। তাকে বলতে হবে, ‘তুমি প্রত্যাশিত ফল পাওনি, কিন্তু তুমি আমাদের কাছে ব্যর্থ নও।’ এই একটি বাক্য হয়তো একটি ভেঙে পড়া মনকে আবার দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া আর জীবনে ব্যর্থ হওয়া এক বিষয় নয়। এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা শিক্ষাজীবনে অসাধারণ ফল করেননি, কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিজেদের যোগ্যতা ও কর্ম দিয়ে পৃথিবীতে অন্যতম জায়গা অর্জন করেছেন। আবার এমন মানুষও আছেন, যারা পরীক্ষায় দুর্দান্ত ফল করেছিলেন, কিন্তু জীবনের নানা চ্যালেঞ্জে নিজেদের সামলে উঠতে পারেননি। কারণ, জীবন কোনো বোর্ড পরীক্ষা নয়। জীবনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অনেক বড়। সেখানে শুধু গণিত, ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা জীববিজ্ঞানের প্রশ্ন থাকে না। সেখানে থাকে সততা, দায়িত্ববোধ, ধৈর্য, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, মানবিকতা, যোগাযোগ দক্ষতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস।

একজন মানুষ পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছে তারচেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, সে মানুষ হিসেবে কেমন হয়েছে। তাই যারা এবার ভালো ফল করেছে, তাদের অভিনন্দন জানাতেই হবে, তাদের পরিশ্রমকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু তাদের এটাও মনে করিয়ে দিতে হবে, জিপিএ-৫ কোনো গন্তব্য নয়, এটি কেবল একটি ধাপ। সামনে আরও বড় পথ। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মজীবন এবং বাস্তব জীবনের অসংখ্য পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। সেখানে শুধু ভালো ফলাফল যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে দক্ষতা, মূল্যবোধ, প্রযুক্তিজ্ঞান, ভাষাজ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।

যারা প্রত্যাশিত ফল পায়নি, তাদের বলি, গল্প এখানেই শেষ নয়। আজকের ফলাফল জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হতে পারে, কিন্তু পুরো বইটির নয়। হয়তো অন্য পথে সফলতা আসবে। হয়তো তোমার শক্তি এমন কোনো জায়গায়, যেটা এই পরীক্ষার খাতা মাপতে পারেনি। হয়তো তোমার আরও সময় প্রয়োজন। হয়তো তোমাকে নতুন করে চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু একটি পরীক্ষার ফলাফলের কারণে নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলো না।

আমাদের অভিভাবকদেরও মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। সন্তানকে প্রতিবেশীর সন্তানের সঙ্গে, আত্মীয়ের সন্তানের সঙ্গে কিংবা বন্ধুর সঙ্গে তুলনা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সন্তানের ফলাফলকে নিজের সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি বানানো যাবে না। সন্তান জিপিএ-৫ না পেলেও সে ভালো মানুষ হতে পারে, সে একজন দক্ষ উদ্যোক্তা হতে পারে, ভালো শিক্ষক হতে পারে, অসাধারণ শিল্পী হতে পারে, গবেষক হতে পারে, দক্ষ কারিগর হতে পারে কিংবা এমন কিছু করতে পারে, যার কথা আজ আমরা কল্পনাও করতে পারছি না।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনেও তাই বড় একটি প্রশ্ন রয়েছে। আমরা কি শুধু ভালো ফল করা শিক্ষার্থী তৈরি করতে চাই, নাকি ভালো মানুষ এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সক্ষম নাগরিক তৈরি করতে চাই? এই প্রশ্নটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও নতুন প্রযুক্তি আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রকে আমূল পরিবর্তন করছে। শুধু মুখস্থ জ্ঞান দিয়ে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে টিকে থাকা কঠিন হবে। যে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে পারে, নতুন কিছু শিখতে পারে, নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে, সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে, ভবিষ্যতে তারাই এগিয়ে থাকবে।

তাই ফলাফলকে সম্মান করুন, কিন্তু ফলাফল দিয়ে সন্তানকে বিচার করবেন না। একটি নম্বর তার খাতার পরিচয় হতে পারে, কিন্তু পুরো জীবনের পরিচয় নয়।

শিক্ষার্থীদের প্রতি বার্তা, আজ ফলাফল যাই আসুক, মনে রেখো—তোমার সামনে এখনো পুরো জীবন পড়ে আছে এবং আর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি এখনো শুরুই হয়নি।

 

মো. তরিকুল ইসলাম: লেখক, কলামিস্ট, শিক্ষা পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

LATEST POSTS

জাকারবার্গের ভাবনায় ‘সবার জন্য এআই’, প্রতিযোগিতায় মেটার নতুন মডেল

ওপেন সোর্স কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ওপর বিধিনিষেধ কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ। একইসঙ্গে ব্যক্তিগত কম্পিউটারেও চালানো যাবে, এমন একটি...

আবারও সন্ধ্যা ৭টায় শপিংমল-দোকান বন্ধের নির্দেশ

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে দেশের সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট আবারও সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।আজ সোমবার বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেশের...

এবারের ঈদের সিনেমার নায়ক কারা

ঈদ আসতে খুব বেশি দেরি নেই। এ উপলক্ষে নির্মিত হচ্ছে নতুন নতুন সিনেমা। এখনো চূড়ান্ত হয়নি কতগুলো সিনেমা মুক্তি পাবে। তবে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। কেউ...

জামায়াত ১৭৯ ও এনসিপি ৩০ আসনে নির্বাচন করবে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৫৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীসহ '১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক‍্য'।এই ২৫৩ আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ১৭৯ আসনে, জাতীয় নাগরিক...

Most Popular